ডাম শারাডস কী: অর্থ, ইতিহাস আর খেলার মূল নিয়ম
ডাম শারাডস কী? এক কথায়, কথা না বলে অভিনয় করে শব্দ বোঝানোর খেলা। একজন কার্ডের শব্দ, সিনেমা বা গানের নাম শুধু অঙ্গভঙ্গিতে দেখায়, আর তার দল সাধারণত ৬০ সেকেন্ডে অনুমান করে। ঠিক হলে এক পয়েন্ট। সব বয়সের মানুষ এটা খেলে।
বাঙালির আড্ডা, স্কুলের অনুষ্ঠান আর পারিবারিক জমায়েতে এটা খুব চেনা খেলা।
ডাম শারাডস নামটা কোথা থেকে এল?
নামটা দুটো ইংরেজি শব্দ মিলে। “শারাড” শব্দটা ইংরেজিতে এসেছে ফরাসি থেকে, যার মানে এক ধরনের শব্দের ধাঁধা। আর “ডাম” মানে নির্বাক বা কথা না বলা। একসাথে মানে দাঁড়ায়: কথা না বলে ধাঁধার উত্তর বোঝানোর খেলা।
বাংলায় এই খেলার কোনো একটা নির্দিষ্ট নাম স্থির হয়নি। কেউ বলেন ডাম শারাডস, কেউ বলেন মূকাভিনয় খেলা বা শব্দ অনুমান খেলা, আবার কেউ শুধু “অভিনয়ের খেলা”। ভারত আর বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে ইংরেজি নামটাই বেশি চলে, তাই বাংলা লেখাতেও আমরা ডাম শারাডসই বলি।
খেলাটার ইতিহাস কী?
শারাডের শুরু আঠারো শতকের ফ্রান্সে, তখন এটা ছিল মুখে বলা বা লিখে দেওয়া শব্দের ধাঁধা। উনিশ শতকে ইংল্যান্ডের অভিজাত পরিবারের বৈঠকখানায় ধাঁধাটা অভিনয় করে দেখানোর চল শুরু হয়। সে সময়ের উপন্যাসেও এর দেখা মেলে, যেমন শার্লট ব্রন্টির “জেন আয়ার”-এ অতিথিরা মিলে শারাড অভিনয় করেন।
পরে খেলাটা আরও সহজ হয়ে দাঁড়ায় আজকের রূপে: একজন নিঃশব্দে অভিনয় করে, দল অনুমান করে। ইংরেজি নামটা থেকেই বোঝা যায়, খেলাটা এই অঞ্চলে এসেছে ইংরেজি-ভাষী দুনিয়া থেকে। আজ বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গে এটা স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান, কলেজের ফেস্ট, বিয়েবাড়ির রাত আর ঈদ বা পূজার আড্ডার চেনা খেলা।
বাঙালি ঘরে খেলাটা নিজের মতো করে বদলেও গেছে। এখানে সিনেমার রাউন্ডে সত্যজিৎ রায় আর উত্তম কুমারের ছবির পাশে হিন্দি আর হলিউডের নামও চলে, গানের রাউন্ডে রবীন্দ্রসংগীত থেকে ব্যান্ডের গান। অনেক পরিবারে আবার প্রবাদ-প্রবচনের আলাদা রাউন্ড থাকে, যেখানে “আঙুল ফুলে কলাগাছ” দেখাতে গিয়ে সবাই হেসে লুটোপুটি খায়।
মূকাভিনয়ের সাথে এর সম্পর্ক কী?
মূকাভিনয় মঞ্চের একটা পূর্ণাঙ্গ শিল্প। শিল্পী কোনো কথা না বলে শুধু শরীর আর মুখের ভাব দিয়ে পুরো গল্প বলেন। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া মূকাভিনয় শিল্পী পার্থপ্রতিম মজুমদার এই শিল্পে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত নাম।
ডাম শারাডস সেই শিল্পেরই ঘরোয়া, খেলাচ্ছলে রূপ। পার্থক্যগুলো এক নজরে:
| বিষয় | মূকাভিনয় | ডাম শারাডস |
|---|---|---|
| উদ্দেশ্য | গল্প বলা, দর্শককে মুগ্ধ করা | দলকে দিয়ে শব্দ অনুমান করানো |
| কে করে | প্রশিক্ষিত শিল্পী | যে কেউ |
| সময় | পুরো পরিবেশনা | প্রতি পালা সাধারণত ৬০ সেকেন্ড |
| ইশারা | শিল্পীর নিজস্ব ভাষা | সবার জানা হাতের সংকেত |
| ফলাফল | হাততালি | পয়েন্ট আর হাসি |
ডাম শারাডস কী নিয়মে চলে?
নিয়মগুলো খুব সহজ, পাঁচ মিনিটে সবাইকে বুঝিয়ে দেওয়া যায়:
- দল ভাগ: খেলোয়াড়েরা দুই বা তার বেশি দলে ভাগ হয়।
- কার্ড তোলা: এক দলের একজন একটা শব্দ বা নাম দেখে, বাকিদের দেখায় না।
- নিঃশব্দ অভিনয়: কথা বলা, ঠোঁট নাড়ানো, কোনো শব্দ করা বা ঘরের জিনিস দেখিয়ে দেওয়া নিষেধ।
- সময়: সাধারণত প্রতি পালায় ৬০ সেকেন্ড, বাচ্চাদের জন্য একটু বেশি।
- অনুমান: নিজের দল চিৎকার করে উত্তর বলে, ঠিক হলে এক পয়েন্ট।
- পালা বদল: এরপর অন্য দলের পালা, শেষে বেশি পয়েন্ট পাওয়া দল জেতে।
প্রচলিত হাতের সংকেতও আছে: সিনেমা বোঝাতে ক্যামেরার হাতল ঘোরানো, গান বোঝাতে মাইক ধরা, বই বোঝাতে দুই হাতের তালু খোলা, আর শব্দের সংখ্যা বোঝাতে আঙুল তোলা। বিস্তারিত নিয়ম জানতে ডাম শারাডস খেলার নিয়ম পাতাটা দেখুন।
প্রথম রাউন্ডের জন্য কোন শব্দ নেবেন?
শুরুতে এমন শব্দ নিন যা দেখানো সহজ আর সবাই চেনে। অভিনয় করো ডেকের নমুনা থেকে কয়েকটা:
- স্ট্র দিয়ে পানি খাওয়া: গ্লাস ধরে ঠোঁট গোল করে টানা।
- পিঠ চুলকানো: এক হাত পেছনে নিয়ে নাগাল না পাওয়ার কষ্ট।
- বেলুন ফোলানো: গাল ফুলিয়ে ফুঁ, হাত দুটো ধীরে বড় করা।
- ঠাসা বাসে ওঠা: হাতল ধরে ঝুলে থাকা আর চারদিক থেকে চাপ খাওয়া।
- নাপিত চুল কাটছে: আঙুলে কাঁচি চালিয়ে আয়নায় দেখানো।
এরপর একটা সিনেমার রাউন্ড চালাতে পারেন। সিনেমা ডেকের নমুনায় হীরক রাজার দেশে, চারুলতা, পিকে আর টাইটানিকের মতো নাম আছে, যা প্রায় সব বাঙালি পরিবার চেনে। আর মানুষের নকল করার মজা পেতে চাইলে অনুকরণ ডেকের সত্যজিৎ রায়, সাকিব আল হাসান বা চা-ওয়ালার মতো কার্ড দারুণ।
ডাম শারাডসের কোন কোন ধরন আছে?
মূল খেলা একই, কিন্তু সময়ের সাথে কয়েকটা জনপ্রিয় ধরন তৈরি হয়েছে। দলের আকার আর মেজাজ বুঝে যেকোনোটা বেছে নিতে পারেন।
| ধরন | কীভাবে চলে | কাদের জন্য ভালো |
|---|---|---|
| ক্লাসিক দলভিত্তিক | একজন অভিনয় করে, নিজের দল অনুমান করে, পালা করে দুই দল | পরিবার, স্কুল, অফিস |
| রিভার্স | পুরো দল একসাথে অভিনয় করে, একজন অনুমান করে | লাজুক মানুষ আছে এমন বড় দল |
| কপালে ফোন | একজন ফোন কপালে ধরে, বাকিরা অভিনয় করে, ঠিক হলে ফোন কাত | বন্ধুদের দ্রুতগতির আড্ডা |
| দুজনে খেলা | দুজন পালা করে অভিনয় আর অনুমান, ঘড়ির বিরুদ্ধে একসাথে পয়েন্ট | ভাইবোন, দম্পতি |
| অনলাইন | ভিডিও কলে একজন অভিনয় করে, বাকিরা দেখে অনুমান করে | দূরে থাকা আত্মীয়-বন্ধু |
ফোন কপালে রেখে খেলার ধরনটা নিয়ে বিস্তারিত জানতে কপালে ফোন রেখে খেলা গাইডটা দেখুন। যে ধরনই খেলুন, মূল নিয়ম একটাই থাকে: অভিনেতা কথা বলবেন না।
কেন এই খেলা এত দিন টিকে আছে?
- সরঞ্জাম লাগে না: কাগজ, কলম আর একটা ঘড়িই যথেষ্ট।
- সব বয়সের খেলা: ছোটরা প্রাণী দেখায়, বড়রা প্রবাদ।
- ভাষার বাধা কম: অভিনয় সবাই বোঝে, তাই মিশ্র ভাষার দলেও চলে।
- মন খুলে যায়: অচেনা মানুষও একবার একসাথে হেসে ফেললে সহজ হয়ে যান, তাই নতুন পরিচয়ের অনুষ্ঠানে এটা দারুণ কাজ করে।
- হাসি নিশ্চিত: কেউ যখন প্রাণপণে “টাইটানিক” দেখাতে গিয়ে সোফায় উঠে দুই হাত মেলে দাঁড়ায়, তখন না হেসে উপায় থাকে না।
প্রথমবার খেলতে বসলে ধাপে ধাপে বুঝে নিতে ডাম শারাডস কীভাবে খেলে গাইডটা পড়ে নিন।